Sunday, 18 March 2018

First Pillar Of Islam Touhid Episode-6(ইসলামের প্রথম রুকুন তাওহীদ পর্ব -6)

(আসুন আমরা ইসলামের প্রথম রুকুন তাওহীদ সমন্ধে জানব )

                                           পর্ব -৬

                         লেখকঃ -মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহাব ,

৫১ - আল্ল­াহ তাআলার আসমায়ে হুসনা [বা সুন্দরতম নামসমূহ]


১। আল্ল­াহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا وَذَرُوا الَّذِينَ يُلْحِدُونَ فِي أَسْمَائِهِ (الأعراف: 180)

‘‘আল্ল­াহর সুন্দর সুন্দর অনেক নাম রয়েছে। তোমরা এসব নামে তাঁকে
ডাকো। আর যারা তাঁর নামগুলোকে বিকৃত করে তাদেরকে পরিহার করে চলো।’’ (আ’রাফ . ১৮০)
২। ইবনে আবি হাতিম ইবনে আববাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, يلحدون فى أسمائه [তারা তাঁর নামগুলো বিকৃত করে] এর অর্থ হচ্ছে তারা শিরক করে্
৩। ইবনে আববাস রা. থেকে আরো বর্ণিত আছে, মুশরিকরা ‘ইলাহ’ থেকে ‘লাত’ আর ‘আজীজ’ থেকে ‘উযযা’ নামকরণ করছে।
৪। আ’মাস থেকে বর্ণিত আছে, মুশরিকরা আল্ল­াহর
নামসমূহের মধ্যে এমন কিছু [শিরকী বিষয়] ঢুকিয়েছে যার অস্তিত্ব আদৌ তাতে নেই।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় .
১। আল্লাহর নামসমূহ যথাযথ স্বীকৃতি
২। আল্ল­াহর নামসমূহ সুন্দরতম হওয়া।
৩। সুন্দর ও পবিত্র নামে আল্ল­াহকে ডাকার নির্দেশ।
৪। যেসব মূর্খ ও বেইমান লোকেরা আল্ল­াহর পবিত্র নামের বিরুদ্ধাচারণ করে তাদেরকে পরিহার করে চলা।
৫। আল্লাহর নামে বিকৃতি ঘটানোর ব্যাখ্যা।

৫২ - ‘‘আসসালামু আলাল্ল­াহ’’ [আল্লাহর ] উপর শান্তি বর্ষিত হোক] বলা যাবে না


১। সহীহ বুখারীতে ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল­াম এর সাথে নামাযে মগ্ন ছিলাম। তখন আমরা বললাম,

السلام على الله من عباده، السلام على فلان فلان

‘‘আল্লাহর উপর তাঁর বান্দাদের পক্ষ থেকে শান্তি হোক, অমুক অমুকের উপর শান্তি বর্ষিত হোক।’’ তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল­াম বললেন,

لا تقولوا السلام على الله، فإن الله هو السلام

‘‘আল্লাহর উপর শান্তি হোক, এমন কথা তোমরা বলো না। কেননা আল্লাহ নিজেই ‘সালাম’ [শান্তি]’’
 অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় .
১। ‘সালাম’ এর ব্যাখ্যা।
২। ‘সালাম’ হচ্ছে সম্মানজনক সম্ভাষণ।
৩। এ [‘সালাম’] সম্ভাষণ আল্লাহর ব্যাপারে প্রযোজ্য নয়।
৪। আল্লাহর ব্যাপারে ‘সালাম’ প্রযোজ্য না হওয়ার কারণ।
৫। বান্দাহগণকে এমন সম্ভাষণ শিক্ষা দেয়া হয়েছে যা আল্লাহর জন্য সমীচীন ও শোভনীয়।

৫৩ - ‘হে আল্লাহ তোমার মর্জি হলে আমাকে মাফ করো’ প্রসঙ্গে


১। সহীহ হাদীসে আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল­াম এরশাদ করেছেন ,

لا يقل أحدكم اللهم اغفر لى إن شئتওاللهم ارحمنى إن شئت، ليعزم المسألة فإن الله لا مكره له.

‘‘তোমাদের মধ্যে কেউ যেন একথা না বলে, ‘হে আল্লাহ, তোমার ইচ্ছা হলে আমাকে মাফ করে দাও, ‘হে আল্লাহ, তোমার ইচ্ছা হলে আমাকে করুণা করো’। বরং দৃঢ়তার সাথে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করবে। কেননা আল্লাহর উপর জবরদস্তী করার মত কেউ নেই।’’ (বুখারি)
২। সহী মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে,

وليعظم الرغبة فإن الله لا يتعاظمه شيئ أعطاه

‘‘আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করার উৎসাহ উদ্দীপনাকে বৃদ্ধি করা উচিৎ। কেননা আল্লাহ বান্দাকে যাই দান করেন না কেন তার কোনটাই তাঁর কাছে বড় কিংবা কঠিন কিছুই নয়।’’

৫৪ - আমার দাস- দাসী বলা নিষিদ্ধ।


১। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে রাসূল (স:) এরশাদ করেছেন,

لا يقل أحدكم أطعم ربك، وضئ ربك، وليقل: سيدى ومولاى، ولا يقل أحدكم عبدى وأمتى، وليقل : فتاى وفتاتى و غلامى.

‘‘ তোমাদের কেউ যেন না বলে, ‘তোমার প্রভুকে খাইয়ে দাও’ ‘তোমার প্রভুকে অজু করাও’। বরং সে যেন বলে, ‘&আমার নেতা’ ‘আমার মনিব’। তোমাদের কেউ যেন না বলে ‘আমার দাস’ ‘আমার দাসী’। বরং সে যেন বলে, ‘আমার ছেলে, আমার মেয়ে, আমার চাকর।’’
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় .
১। আমার দাস- দাসী বলা নিষিদ্ধ।
২। কোন গোলাম যেন তার মনিবকে না বলে, ‘আমার প্রভু’। এ কথাও যেন না বলে, ‘তোমার রবকে আহার করাও’।
৩। প্রথম শিক্ষণীয় বিষয় হলো, ‘আমার ছেলে’ ‘আমার মেয়ে’ ‘আমার চাকর’ বলতে হবে।
৪। দ্বিতীয় শিক্ষণীয় বিষয় হলো, ‘আমার নেতা,’ ‘আমার মনিব’ বলতে হবে।
৫। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের প্রতি শতর্কতা অবলম্বন। আর তা হচ্ছে, শব্দ ব্যবহার ও প্রয়োগের মধ্যেও তাওহীদের শিক্ষা বাস্তবায়ন করা।

৫৫ - আল্লাহর ওয়াস্তে আশ্রয় প্রার্থনাকারীকে আশ্রয় দান।


আল্লাহর ওয়াস্তে সাহায্য চাইলে বিমুখ না করা
১। ইবনে ওমর রা. থেকে বর্নিত আছে, রাসূল সাল্লাল্ল­াহু আলাইহি ওয়া সাল্ল­াম এরশাদ করেছে,

 من سأل بالله فأعطوه، ومن أستعاذ بالله فأعيذوه، ومن دعاكم فأجيبوه، ومن صنع إليكم معروفا فكافئوه، فإن لم تجدوا ما تكافئونه فادعوا له حتى تروا أنكم قد كافأتموه. (رواه أبوداود والنسائى بسند صحيح)

‘‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ওয়াস্তে চায় তাকে দান করো। যে ব্যক্তি আল্লাহর ওয়াস্তে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তাকে আশ্রয় দাও। যে ব্যক্তি আল্লাহর নামে ডাকে, তার ডাকে সাড়া দাও। যে ব্যক্তি তোমাদের জন্য ভাল কাজ করে, তার যথোপযুক্ত প্রতিদান দাও। তার প্রতিদানের জন্য যদি তোমরা কিছুই না পাও, তাহলে তার জন্য এমন দোয়া করো, যার ফলে এটাই প্রমাণিত হয় যে, তোমরা তার প্রতিদান দিতে পেরেছো। ’’ (আবু দাউদ, নাসায়ী)
এ অধ্যায় থেকে নিম্ন বর্ণিত বিষয়গুলো জানা যায় .
১। আল্লাহর ওয়াস্তে আশ্রয় প্রার্থনাকারীকে আশ্রয় দান।
২। আল্লাহর ওয়াস্তে সাহায্য প্রার্থনাকারীকে সাহায্য প্রদান।
৩। [নেক কাজের] আহবানে সাড়া দেয়া।
৪। ভাল কাজের প্রতিদান দেয়া।
৫। ভাল কাজের প্রতিদানে অক্ষম হলে উপকার সাধনকারীর জন্য দোয়া করা।
৬। এমন খালেসভাবে উপকার সাধনকারীর জন্য দোয়া করা, যাতে মনে হয়, যথোপযুক্ত প্রতিদান দেয়া হয়েছে। রাসূল সাল্ল­াল্ল­াহু আলাইহি ওয়া সাল্ল­াম এর বাণী حتى تروا أنكم قد كافأتموه দ্বারা এটাই বুঝানো হয়েছে।

৫৬ - ‘‘বি ওয়াজহিল্ল­াহ’ বলে একমাত্র জান্নাত ব্যতীত আর কিছুই প্রার্থনা করা যায় না।


১। জাবের রা. থেকে বর্নিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল­াম এরশাদ করেছেন,

لا يسأل بوجه الله إلا الجنة (رواه أبوداؤد)

‘‘বিওয়াজহিল­াহ [আল্লাহর চেহারার ওসীলা] দ্বারা একমাত্র জান্নাত ছাড়া অন্য কিছুই চাওয়া যায় না।’’ (আবু দাউদ)
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় .
১। চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্থাৎ জান্নাত ব্যতীত ‘বিওয়াজহিল­াহ’’ দ্বারা অন্য কিছু চাওয়া যায় না।
২। আল্লাহর ‘চেহারা’ নামক সিফাত বা গুনের স্বীকৃতি।

৫৭ - [বাক্যের মধ্যে ‘যদি’ ব্যবহার সংক্রান্ত আলোচনা]


১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

يَقُولُونَ لَوْ كَانَ لَنَا مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ مَا قُتِلْنَا هَاهُنَا (آل عمران ১৫৪)

‘‘তারা বলে, ‘যদি’ এ ব্যাপারে আমাদের করণীয় কিছু থাকতো, তাহলে আমরা এখানে নিহত হতাম না’’ (আল ইমরান . ১৫৪)
২। আল্লাহ তাআলা আরো এরশাদ করেছেন,

الَّذِينَ قَالُوا لِإِخْوَانِهِمْ وَقَعَدُوا لَوْ أَطَاعُونَا مَا قُتِلُوا (آل عمران: 168)

‘‘যারা ঘরে বসে থেকে [যুদ্ধে না গিয়ে তারেদ [যোদ্ধা] ভাইদেরকে বলে, আমাদের কথা মতো যদি তারা চলতো। তবে তারা নিহত হতো না। (আল-ইমরান . ১৬৮)
৩। সহীহ বুখারীতে আয়েশা রা. হবে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

أحرص على ما ينفعك، واستعن بالله ولا تعجز، وإن أصابك شئ فلا تقل لو أننى فعلت كذا لكان كذا وكذا ولكن قل: قدر الله وما شاء فعل، فإن لو تفتح عمل الشيطان

‘‘যে জিনিস তোমার উপকার সাধন করবে, তার ব্যাপারে আগ্রহী হও এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও, আর কখনো অক্ষমতা প্রকাশ করো না। যদি তোমার উপর কোন বিপদ এসে পড়ে, তবে এ কথা বলো না, ‘যদি
আমি এরকম করতাম, তাহলে অবশ্যই এমন হতো’। বরং তুমি এ কথা বলো, ‘আল্লাহ যা তাকদীরে রেখেছেন এবং যা ইচ্ছা করেছেন তাই হয়েছে। কেননা ‘যদি’ কথাটি শয়তানের জন্য কুমন্ত্রণার পথ খুলে দেয়।’’ (বুখারি)
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় .
১। সূরা আল- ইমরানের ১৫৪ নং আয়াত এবং ৬৮ নং আয়াতের উল্লে­খিত অংশের তাফসীর।
২। কোন বিপদাপদ হলে ‘যদি’ প্রয়োগ করে কথা বলার উপর সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা।
৩। শয়তানের [কুমন্ত্রণামূলক] কাজের সুযোগ তৈরীর কারণ।
৪। উত্তম কথার প্রতি দিক নির্দেশনা।]
৫। উপকারী ও কল্যাণজনক বিষয়ে আগ্রহী হওয়ার সাথে সাথে আল্লাহর কাছে সাহায্য কামনা করা।
৬। এর বিপরীত অর্থাৎ ভাল কাজে অপারগতা ও অক্ষমতা প্রদর্শণের উপর নিষেধাজ্ঞা।

৫৮ - বাতাসকে গালি দেয়া নিষেধ


১। উবাই ইবনে কা’ব রা. থেকে বর্ণিত আছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল­াম এরশাদ করেছেন,

لا تسبوا الريح، فإذا رايتم ما تكرهون فقولوا:

‘‘তোমরা বাতাসকে গালি দিও না। তোমরা যদি বাতাসের মধ্যে তোমাদের অপছন্দনীয় কিছু প্রত্যক্ষ করো তখন তোমরা বলো,

 أللهم إنا نسألك من خير هذه الريح وخير ما فيها وخير ما أمرت به، ونعوذبك من شر هذه الريح وشر ما فيها وشر ما أمرت به. (صحيح الترمذى)

‘‘হে আল্লাহ এ বাতাসের যা কল্যাণকর, এতে যে মঙ্গল নিহিত আছে এবং যতটুকু কল্যাণ করার জন্য সে অদিষ্ট হয়েছে ততটুকু কল্যাণ ও মঙ্গল আমরা তোমার কাছে প্রার্থনা করি। আর এ বাতাসের যা অনিষ্টকর, তাতে যে অমঙ্গল লুকায়িত আছে, এবং যতটুকু অনিষ্ট সাধনের ব্যাপারে সে
আদিষ্ট হয়েছে তা [অমঙ্গল ও অনিষ্ঠতা] থেকে আমরা তোমার কাছে আশ্রয় চাই। [তিরমিজি হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন]

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় .
১। বাতাসকে গালি দেয়া নিষেধ।
২। মানুষ যখন কোন অপছন্দনীয় জিনিস দেখবে তখন কল্যাণকর কথার মাধ্যমে দিক নির্দেশনা দান করবে।
৩। বাতাস আল্লাহর পক্ষ থেকে আদিষ্ট, একথার দিক নির্দেশনা।
৪। বাতাস কখনো কল্যাণ সাধনের জন্য আবার কখনো অকল্যাণ করার জন্য আদিষ্ট হয়।

৫৯ - ১। সূরা আল- ইমরানের ১৫৪ নং আয়াতের তাফসীর ও সূরা ‘‘ফাতাহ’’ এর ৬ নং আয়াতের তাফসীর।


১। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

يَظُنُّونَ بِاللَّهِ غَيْرَ الْحَقِّ ظَنَّ الْجَاهِلِيَّةِ يَقُولُونَ هَلْ لَنَا مِنَ الْأَمْرِ مِنْ شَيْءٍ قُلْ إِنَّ الْأَمْرَ كُلَّهُ لِلَّهِ (آل عمران: 154)

‘‘তারা জাহেলী যুগের ধারণার মত আল্লাহ সম্পর্কে অবাস্তব ধারণা পোষণ করে। তারা বলে, ‘আমাদের জন্য কি কিছু করণীয় আছে? [হে রাসূল ] আপনি বলে দিন, ‘সব বিষয়ই আল্লাহর ইখতিয়ারভূক্ত।’’ [আল-ইমরান . ১৫৪]
২। আল্লাহ তাআলা আরো এরশাদ করেছেন,

الظَّانِّينَ بِاللَّهِ ظَنَّ السَّوْءِ عَلَيْهِمْ دَائِرَةُ السَّوْءِ (الفتح: 6)

‘‘তারা [মুনাফিকরা] আল্লাহ সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণ করে, তারা নিজেরাই খারাপ ও দোষের আবর্তে নিপতিত।’’ (আল-ফাতাহ . ৬]
প্রথম আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনুল কাইয়্যিম বলেছেন, ظن এর ব্যাখ্যা এটাই করা হয়েছে যে, মুনাফিকদের ধারণা হচ্ছে আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলকে সাহায্য করেন না। তাঁর বিষয়টি অচিরেই নিঃশেষ হয়ে যাবে। ব্যাখ্যায় আরো বলা হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল­াম এর উপর যে সব বিপদাপদ এসেছে তা আদৌ আল্লাহর ফয়সালা, তাকদীর এবং হিকমত মোতাবেক হয়নি।
উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় আরও বলা হয়েছে যে, মানুফিকরা আল্লাহর হিকমত, তাকদীর, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পূর্ণাঙ্গ রিসালত এবং সকল দ্বীনের উপর আল্লাহর দীন তথা ইসলামের বিজয়কে অস্বীকার করেছে। আর এটাই হচ্ছে সেই খারাপ ধারণা যা সূরা ‘ফাতহে’ উলে­খিত মুনাফিক ও মুশরিকরা পোষণ করতো। এ ধারণা খারাপ হওয়ার কারণ এটাই যে, আল্লাহ তাআলার সুমহান মর্যাদার জন্য ইহা শোভনীয় ছিল না। তাঁর হিকমত প্রশংসা এবং সত্য ওয়াদার জন্যও উক্ত ধারণা ছিল বেমানান, অসৌজন্যমুলক।
যে ব্যক্তি মনে করে যে, আল্লাহ তাআলা বাতিলকে হকের উপর এতটুকু বিজয় দান করেন, যাতে হক অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে, অথবা যে ব্যক্তি আল্লাহর ফয়সালা, তাকদীরের নিয়মকে অস্বীকার করে, অথবা তাকদীর যে আল্লাহর হক মহা কৌশল এবং প্রশংসার দাবীদার এ কথা অস্বীকার করে, সাথে সাথে এ দাবীও করে যে, এসব আল্লাহ তাআলার নিছক অর্থহীন ইচ্ছামাত্র; তার এ ধারণা কাফেরদের ধারণা বৈ কিছু নয়। তাই জাহান্নামের কঠিন শাস্তি এ সব কাফেরদের জন্যই নির্ধারিত রয়েছে।
অধিকাংশ লোকই নিজেদের [সাথে সংশি­ষ্ট] বিষয়ে এবং অন্যান্য লোকদের বেলায় আল্লাহ তাআলার ফয়সালার ব্যাপারে খারাপ ধারণা পোষণ করে। যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলা তাঁর আসমা ও সিফাত [নাম ও গুণাবলী] এবং তাঁর হিকমত ও প্রশংসা সম্পর্কে অবগত রয়েছে, কেবলমাত্র সেই আল্লাহর প্রতি এ খারাপ ধারণা থেকে মুক্ত থাকতে পারে।
যে ব্যক্তি প্রজ্ঞা সম্পন্ন, বুদ্ধিমান এবং নিজের জন্য কল্যাণকামী, তার উচিৎ এ আলোচনা দ্বারা বিষয়টির অপরিসীম গুরুত্ব অনুধাবন করা। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি স্বীয় রব সম্পর্কে খারাপ ধারণা করে, তার উচিৎ নিজ বদ-ধারণার জন্য আল্লাহর নিকট তওবা করা।
আল্লাহর প্রতি খারাপ ধারণা পোষণকারী কোন ব্যক্তিকে যদি তুমি পরীক্ষা করো, তাহলে দেখতে পাবে তার মধ্যে রয়েছে তাকদীরের প্রতি হিংসাত্মক বিরোধীতা এবং দোষারোপ করার মানসিকতা। তারা বলে, বিষয়টি এমন হওয়া উচিৎ ছিলো। এ ব্যাপারে কেউ বেশী, কেউ কম বলে থাকে তুমি তোমার নিজেকে পরীক্ষা করে দেখো, তুমি কি এ খারাপ ধারণা থেকে মুক্ত? কবির ভাষায় .
মুক্ত যদি থাকো তুমি এ খারাবী থেকে,
বেঁচে গেলে তুমি এক মহা বিপদ থেকে।
আর যদি নাহি পারো ত্যাগিতে এ রীতি,
বাঁচার তরে তোমার লাগি নাইকো কোন গতি।
এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় .
১। সূরা আল- ইমরানের ১৫৪ নং আয়াতের তাফসীর।
২। সূরা ‘‘ফাতাহ’’ এর ৬ নং আয়াতের তাফসীর।
৩। আলোচিত বিষয়ের প্রকার সীমাবদ্ধ নয়।
৪। যে ব্যক্তি আল্লাহর আসমা ও সিফাত, [নাম ও গুণাবলী] এবং নিজের জ্ঞান সম্পর্কে অবহিত রয়েছে, কেবলমাত্র সেই আল্লাহর প্রতি কু-ধারণা পোষণ করা থেকে বাঁচতে পারে।

৬০ - তাকদীর অস্বীকারকারীদের পরিণতি


১। ইবনে ওমর রা. বলেছেন,

    والذى نفس ابن عمر بيده لوكان لأحدهم مثل أحد ذهبا ثم أنفقه فى سبيل الله ما فبله الله منه.

‘‘সেই সত্তার কসম, যার হাতে ইবনে ওমরের জীবন, তাদের (তাকদীর অস্বীকারীদের) কারো কাছে যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণও থাকে, অতঃপর তা আল্লাহর রাস্তায় দান করে দেয়, ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা উক্ত দান কবুল করবেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তাকদীরের প্রতি ঈমান আনে’’। অতঃপর তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণী দ্বারা নিজ বক্তব্যের পক্ষে দলীল পেশ করেন,

الإيمان أن نومن بالله وملائكته وكتبه و رسله واليوم الأخر و تؤمن بالقدر خيره وشره. (رواه مسلم)

‘‘ঈমান হচ্ছে এই যে, তুমি আল্লাহ তাআলা, তাঁর সমুদয় ফিরিস্তা, তাঁর যাবতীয় [আসমানী] কিতাব, তাঁর সমস্ত রাসূল এবং আখেরাতের প্রতি
ঈমান আনয়ন করবে সাথে সাথে তাকদীর এবং এর ভাল-মন্দের প্রতি ঈমান আনয়ন করবে।’’ (মুসলিম)
২। উবাদা বিন সামেত রা. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি তার ছেলেকে বললেন, ‘‘হে বৎস, তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানের স্বাদ অনুভব করতে পারবে না, যতক্ষণ না তুমি এ কথা বিশ্বাস করবে, ‘তোমার জীবনে যা ঘটেছে তা ঘটারই ছিল। আর তোমার জীবনে যা ঘটেনি তা কোনদিন তোমার জীবনে ঘটার ছিলোনা।’’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল­ামকে আমি এ কথা বলতে শুনেছি,

إن أول ما خلق الله القلم فقال له أكتب، فقال : رب ماذا اكتب؟ قال : أكتب مقادير كل شئ حتى تقوم الساعة.

‘‘সর্বপ্রথম আল্লাহ তাআলা যা সৃষ্টি কলেন তা হচ্ছে ‘কলম’। সৃষ্টির পরই তিনি কলমকে বললেন, ‘‘লিখ’’। কলম বললো, ‘হে আমার রব, ‘আমি কি লিখবো?’ তিনি বললেন, ‘কেয়ামত সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত সব জিনিসের তাকদীর লিপিবদ্ধ করো।’’ হে বৎস রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আমি বলতে শুনেছি,

من مات على غير هذا فليس منى

‘‘যে ব্যক্তি [তাকদীরের উপর] বিশ্বাস ব্যতীত মৃত্যু বরণ করলো, সে আমার উম্মতের মধ্যে গণ্য নয়।’’
অন্য একটি রেওয়ায়েত বর্ণিত আছে,

إن أول ما خلق الله تعالى القلم فقال له أكتب فجرى فى تلك الساعة ما هو كائن إلى يوم القيامة.

‘‘আল্লাহ তাআলা সর্ব প্রথম যা সৃষ্টি করলেন তা হচ্ছে ‘কলম’। এরপরই তিনি কলমকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘লিখ’। কেয়ামত পর্যন্ত যা সংঘটিত হবে, সে মুহুর্তে থেকে কলম তা লিখতে শুরু করে দিল। (আহমদ)
৩। ইবনে ওয়াহাবের একটি বর্ণনা মতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল­াম এরশাদ করেছেন,

فمن لم يؤمن بالقدر خيره وشره أحرقه الله بالنار

‘‘যে ব্যক্তি তাকদীর এবং তাকদীরের ভাল- মন্দ বিশ্বাস করে না, তাকে আল্লাহ তাআলা জাহান্নামের আগুনে জ্বালাবেন করবেন।’’
ইবনুদ্দাইলামী থেকে বর্ণিত আছে, কাতাদাহ রা. বলেন, ‘আমি ইবনে কা’ব এর কাছে আসলাম। তারপর বললাম, ‘তাকদীরের ব্যাপারে আমার মনে কিছু কথা আছে। আপনি আমাকে তাকদীর সম্পর্কে কিছু উপদেশমূলক কথা বলুন। এর ফলে হয়তো আল্লাহ তাআলা আমার অন্তর থেকে উক্ত জমাট বাধা কাদা দূর করে দিবেন। তখন তিনি বললেন, ‘তুমি যদি উহুদ [পাহাড়] পরিমাণ স্বর্ণও আল্লাহর রাস্তায় দান করো, আল্লাহ তোমার এ দান ততক্ষণ পর্যন্ত কবুল করবেন না, যতক্ষণ না তুমি তাকদীরকে বিশ্বাস করবে। আর এ কথা জেনে রাখো, তোমার জীবনে যা ঘটেছে তা ঘটতে কখনো ব্যতিক্রম হতো না। আর তোমার জীবনে যা সম্পর্কিত এ বিশ্বাস পোষণ না করে মৃত্যু বরণ করো, তা হলে অবশ্যই জাহান্নামী হবে’। তিনি বলেন, অতঃপর আমি আবদুল­াহ ইবনে মাসউদ, হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান এবং যায়েদ বিন ছাবিত রা. এর নিকট গেলাম। তাঁদের প্রত্যেকেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এরকম হাদীসই বর্ণনা করেছেন।’’ ( হাকিম)

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয় গুলো জানা যায় .
১। তাকদীরের প্রতি ঈমান আনা ফরজ এর বর্ণনা।
২। তাকদীরের প্রতি কিভাবে ঈমান আনতে হবে, এর বর্ণনা।
৩। তাকদীরের প্রতি যার ঈমান নেই তার আমল বাতিল।
৪। যে ব্যক্তি তাকদীরের প্রতি ঈমান আনেনা সে ঈমানের স্বাদ অনুধাবন করতে অক্ষম।
৫। সর্বাগ্রে যা সৃষ্টি হয়েছে তার উল্লেখ।
৬। কেয়ামত পর্যন্ত যা সংঘটিত হবে, সৃষ্টির পর থেকেই কলম তা লিখতে শুরু করেছে।
৭। যে ব্যক্তি তাকদীর বিশ্বাস করে না তার ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল­াম দায়িত্বমুক্ত।
৮। সালাফে সালেহীনের রীতি ছিল, কোন বিষয়ের সংশয় নিরসনের জন্য জ্ঞানী ও বিজ্ঞজনকে প্রশ্ন করা।
৯। ঊলামায়ে কেরাম এমন ভাবে প্রশ্ন কারীকে জবাব দিতেন যা দ্বারা সুন্দেহ দূর হয়ে যেতো। জবাবের নিয়ম এই যে, তাঁরা নিজেদের কথাকে শুধুমাত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল­াম এর [কথা ও কাজের] দিকে সম্পৃক্ত করতেন।
Continue....
Share This
Previous Post
Next Post

Pellentesque vitae lectus in mauris sollicitudin ornare sit amet eget ligula. Donec pharetra, arcu eu consectetur semper, est nulla sodales risus, vel efficitur orci justo quis tellus. Phasellus sit amet est pharetra

0 মন্তব্য(গুলি):

thank you for comment